Showing posts with label স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা. Show all posts
Showing posts with label স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা. Show all posts

Sunday, December 20, 2015

যে খাবারগুলো কখনোই খালি পেটে খাবেন না



কিছু খাবার রয়েছে যা খালি পেটে খাওয়া একদম ঠিক নয়। সম্প্রতি একটি গবেষণায় এ খাবারগুলোর কথা বলা হয়েছে। এই খাবারগুলো এসিড তৈরি করে এবং অন্ত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। লাইফস্টাইল ওয়েবসাইট বোল্ডস্কাই জানিয়েছে এ খাবারগুলোর কথা।



১. টমেটো
টমোটো খালি পেটে খাওয়া হলে এর মধ্যে বিদ্যমান এসিড গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল এসিডের সাথে মিশে পাকস্থলির মধ্যে বিক্রিয়া করে এক ধরনের অদ্রবণীয় জেল তৈরি করে; যা পাকস্থলিতে পাথর হওয়ার কারণ হতে পারে।

২. সোডা
সোডার মধ্যে রয়েছে উচ্চ পরিমাণ কাবোর্নেটেট এসিড। খালি পেটে সোডা খাওয়া হলে এই এসিড স্বাস্থ্যের সমস্যা তৈরি করে এবং বমিবমি ভাব তৈরি করে।

৩. ওষুধ 
কিছু কিছু গ্যাসট্রিকের ওষুধ খাওয়ার আগে খেতে বলা হয়। তবে অধিকাংশ ওষুধ ভরা পেটে খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। যখন খালি পেটে ওষুধ খাওয়া হয় এটা পাকস্থলিতে অস্বস্থিকর অবস্থার তৈরি করে।

৪. মদ্যপান
মদ্যপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আর খালি পেটে মদ্যপান আরো ক্ষতিকর। মদের মধ্যে যেসব উপাদান রয়েছে সেগুলো অন্ত্রের জ্বালাভাব তৈরি করে।

৫. ঝাল জাতীয় খাবার
আমরা অনেকেই ঝাল জাতীয় খাবার খেতে ভালোবাসি, তবে খালি পেটে ঝাল জাতীয় খাবার খাওয়া ঠিক নয়। এর ফলে এসিডিক বিক্রিয়া হয়ে পেট জ্বালাভাব তৈরি হয়।

৬. কফি
খালি পেটে কফি খাওয়া খুবই ক্ষতিকর। কফির মধ্যে থাকা ক্যাফেইন পাকস্থলির জন্য ভালো নয়। তাই খেতে হলে আগে অন্তত একগ্লাস পানি খেয়ে নিন।

৭. চা
চা-ও কফির মতো, খালি পেটে খাওয়া ঠিক নয়। চায়ের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মাত্রায় এসিড যা পাকস্থলির আবরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৮. দই 
দইয়ের প্রোবায়োটিক উপাদান স্বাস্থ্যকর। তবে যদি এটা খালি পেটে খাওয়া হয় তবে স্বাস্ব্যকর নয়। দইয়ে থাকা ভালো ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলির আবরণের রসের সাথে মিশে পেটকে খারাপ করতে পারে।

৯. মিষ্টি আলু
আপনি কি জানেন মিষ্টি আলুর মধ্যে রয়েছে ট্যানিন এবং পেকটিন? এটা বেশি পরিমাণে এসিড নিঃসরণ করে পাকস্থলির দেয়ালকে সংকুচিত করে। এর ফলে বুক জ্বালাপোড়া হয়।

১০. কলা
খালি পেটে কলা খাওয়া হঠাৎ করে শরীরে ম্যাগনেসিয়াম বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রক্তে ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়ামের ভারস্যাম্য নষ্ট করে। তাই কলা খালি পেটে না খাওয়ার পরামর্শই দেন বিশেষজ্ঞরা।

Friday, December 11, 2015

ডায়াবেটিসজনিত চোখের রোগ



শরীরের ইনসুলিন হরমোনের অভাব বা স্বল্পতাজনিত কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশী হওয়াকে ডায়াবেটিস বলে। ডায়াবেটিস শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে আক্রান্ত করে। চোখ তার মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীব্যাপী অন্ধত্বের চারটি প্রধান কারণের মধ্যে ডায়াবেটিসজনিত চোখের রোগ একটি। অন্য কারণগুলো হলো-চোখের ছানি, কর্ণিয়ার রোগ ও গ্লুকোম।



১. প্রতিসরণজনিত দৃষ্টি স্বল্পতা বা রিফ্রাকটিভ:

(
ক) মায়োপিয়া বা নিকট দৃষ্টিঃ দূরের জিনিস ঝাপসা দেখা যায়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে চোখের অ্যাকুয়াস হিউমারেও গ্লুকোজ বেড়ে যায়। তখন বেশী পরিমাণে গ্লুকোজ লেন্সের কর্টেক্সে ঢুকে। এতে লেন্সের কর্টেক্সেও পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। এজন্য লেন্সের নিউক্লিয়াসের প্রতিসরণ সূচক বেড়ে যায়। ফলে কোন বস্তুর প্রতিবিম্ব রেটিনাতে না পড়ে তার সামনে পড়ে।

(
খ) হাইপারমেট্রোপিয়া বা দূরদৃষ্টি: কাছের জিনিস ঝাপসা দেখা যায়। চিকিত্সার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত হলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়। লেন্সের কর্টেক্সে গ্লুকোজের পরিমাণও স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে লেন্সের কর্টেক্সের পানির পরিমাণ কমে যায়। সেজন্য লেন্সের নিউক্লিয়াসের প্রতিসরণ সূচক কমে যায়। ফলে কোন বস্তুুর প্রতিবিম্ব রেটিনাতে না পড়ে তার পিছনে পড়ে। চিকিত্সা দ্বারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত হওয়ার এক থেকে দেড় সপ্তাহ পরে চোখের চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করা উচিত।

২. চোখের ছানি বা ক্যাটার্যাক্ট ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ডায়াবেটিক রোগীদের দ্রুত ছানি পড়তে দেখা যায়। এ ধরণের ছানি তরুণ বয়সেও পড়তে পারে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে চোখের লেন্সেও গ্লুকোরেজ মাত্রা বেড়ে যায়। এতে লেন্সে বেশী পরিমাণে পানি ঢুকে। ফলে লেন্স অস্বচ্ছ হয় ও ছানি পড়ে। বৃদ্ধ বয়সে অনেকের ছানি পড়ে। এক্ষেত্রে ডায়াবেটিস ছানি পড়াকে ত্বরান্বিত করে।

চািকত্সা:

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে ছানি অপারেশন করে চোখের ভিতর কৃত্রিম লেন্স লাগানো হয়। ডায়াবেটিক রোগীদের ছানি অপারেশনে কোন বাধা বা ভয় নেই।

৩. ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি

ডায়াবেটিস চোখের ভিতরের স্নায়ুপর্দা বা রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালীতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনে যা শেষ পর্যন্ত চোখকে দৃষ্টিহীন করে দিতে পারে। ডায়াবেটিক রোগীদেও চোখের এই অবস্থাকেই বলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি।

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির ঝুকি

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাদের ৩০ বত্সর বয়সের আগে ডায়াবেটিস হয় তাদের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শতকরা ৫০ জনের ১০ বত্সরের মধ্যে এবং শতকরা ৯০ জনের ৩০ বত্সরের মধ্যে দেখা দেয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি তাড়াতাড়ি দেখা দেয় এবং চোখ দ্রুত অন্ধ হয়ে যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বিলম্বিত হয়, রেটিনোপ্যাথির মাত্রা কম হয় এবং চোখ অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা পায়। কিছু বিষয় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে-যেমন গর্ভধারণ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির অসুখ, রক্তশূণ্যতা, সূ্থ্থলতা, ধূমপান ইত্যাদি।

কিভাবে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হয়

১. ক্ষুদ্র রক্তনালী বা ক্যাপিলারীর মাধ্যমে রক্তের অক্সিজেন শরীরের কোষে প্রবেশ করে ও কোষের কার্বন ডাই অক্সাইড রক্তে আসে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে ক্যাপিলারী বেজমেন্ট মেমব্রেন স্থূল হয়ে যায়, ক্যাপিলারী কোষ নষ্ট হয়ে যায়, লোহিত রক্ত কণিকার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার ফলে অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা কমে যায় এবং রক্তের অনুচক্রিকার জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে রেটিনাতে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দেয়। এতে ক্যাপিলারী পর্যায়ে শিরা ও ধমনীতে অস্বাভাবিক রক্ত চলাচল ও শান্ট সৃষ্টি হয় এবং নতুন রক্তনালী সৃষ্টির প্রবণতা দেখা দেয়।

২. ক্ষুদ্র রক্তনালী ছিদ্র হয়ে যাওয়া- ক্যাপিলারী কোষগুলো দুই প্রকার এন্ডোথেলিয়াম ও পেরিসাইট। ক্যাপিলারীগুলো পেরিসাইট দ্বারা শক্ত বাঁধনের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সাধারণত প্রতিটি এন্ডোথেলিয়াম কোষে একটি করে পেরিসাইট থাকে। কিন্তু ডায়াবেটিক রোগীদের রেটিনাতে পেরিসাইটের স্বল্পতা দেখা দেয়। ফলে ক্যাপিলারীর দেয়াল স্ফীত হয়ে যায় এবং রক্তের জলীয় অংশ বা প্লাজমা রেটিনাতে ঢুকে। ক্যাপিলারীর যে অংশ স্ফীত হয়ে ছোট থলের আকার ধারণ করে তাকে মাইক্রোঅ্যানিউরিজম বলে। এ থেকে রেটিনাতে রক্তপাত হয় এবং স্বল্প পরিসরে বা বিস্তৃতভাবে পানি জমে। রেটিনাতে স্বল্প পরিসরে পানি জমার ফলে হার্ড এক্সুডেট তৈরি হয়।

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির শ্রেণী বিন্যাস:

ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়।

(
ক) ব্যাকগ্রাউন্ড ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি যেমন-মাইক্রোঅ্যানিউরিজম, রেটিনাতে বিন্দুর মত রক্তক্ষরণ (ডট হিমোরেজ), হার্ড এক্সুডেট ও রেটিনাতে পানি জমা।

চিকিত্সা:ব্যাকগ্রাউন্ড ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির সুনির্দিষ্ট কোন চিকিত্সা নেই। তবে ম্যাকুলার
কেন্দ্র হতে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে পানি বা হার্ড এক্সুডেট জমলে লেজারের সাহায্যে চিকিত্সা করা হয়। রোগীকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রক্তশূণ্যতার চিকিত্সা করতে হবে। ধূমপান, মদ্যপান সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে। বছরে অন্তত একবার চোখ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।

(
খ) প্রিপ্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, যথা-রক্তনালীর বিশেষতঃ শিরার পরিবর্তন- শিরার পুতির মালার মত হয়ে যাওয়া, বেঁকে যাওয়া ও মাংসের কাবাবে মত খন্ডাংশে পরিণত হওয়া, রেটিনাতে বিশেষ ধরণের রক্তক্ষরণ. তুলার আশের মত দাগ বা চিহ্ন এবং রেটিনার ভিতরের ক্ষুদ্র রক্তনালীর অস্বাভাবিকতা।

চিকিত্সা: এই স্তরেও সুনির্দিষ্ট কোন চিকিত্সা নেই।তবে রোগীকে চক্ষু বিশেষজ্ঞ দ্বারা নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে লেজার চিকিত্সা লাগতে পারে। তবে তা ফান্ডাস ফ্লুরোসেন্স এনজিওগ্রাফির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।

(গ) প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি যেমন-

১. নতুন রক্তনালী সৃষ্টি হওয়া।

২. চোখের ভিতরের জেলীর মত জিনিস বা ভিট্রাসের রেটিনা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

৩. নতুন রক্তনালী থেকে রেটিনা,

রেটিনার সামনে ও ভিট্রাসে রক্তক্ষরণ। জটিলতা; ভিট্রাসে রক্তক্ষরণ, রেটিনার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, আইরিশে নতুন রক্তনালী সৃষ্টি হওয়া ও চোখের চাপ বেড়ে গ্লুকোমা হয়ে যাওয়া।

চিকিত্সা: প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে রেটিনাতে অনেক নতুন রক্তনালী সৃষ্টি হয়, যা থেকে যে কোন সময় রক্তক্ষরণ হতে পারে। লেজারের সাহায্যে এসব নতুন রক্তনালীগুলো নষ্ট করে দেয়া হয়। যদি রেটিনা বা ভিট্রাসে রক্তক্ষরণ হয় তবে তা চিকিত্সার মাধ্যমে কমিয়ে পরে লেজারের সাহায্যে চিকিত্সা করা হয়। আবার ভিট্রাসের রক্ত যদি দীর্ঘ সময় পরও পরিষ্কার না হয় তবে ভিট্রাস অপারেশনের মাধ্যমে বের করে ফেলা হয়, যা ভিট্রেক্টোমি নামে পরিচিত। ভিট্রেক্টোমির সাথে বা পরে লেজার চিকিত্সা দেয়া হয়।

ডায়াবেটিক রোগীদের চোখের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

ডায়াবেটিস ধরা পড়লে বত্সরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞ দ্ব্বারা চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। ডায়াবেটিস অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। একবার ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হয়ে গেলে তার উপযুক্ত চিকিত্সা করাতে হবে। তা না হলে জীবনে অন্ধত্বের অভিশাপ নেমে আসতে পারে।

চোখের ছানি চিকিৎসা


বয়সজনিত কারণে চোখের ছানি হয়ে থাকে। ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যাটারেক্ট। আমাদের দেশেও এ রোগটি রয়েছে। অসাবধানতা, দরিদ্রতা, অবহেলার কারণে এর চিকিৎসা না। কিন্তু এর রয়েছে উন্নত চিকিৎসা। অত্যন্ত কম খরচে এই রোগের চিকিৎ সম্ভব। ক্যাটারেক্ট বা ছানি রোগ বিষয়ে আমরা শরণাপন্ন হই অধ্যাপক এএসএম কামালউদ্দিনের। তিনি এ রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। অধ্যাপক কামালউদ্দিন ঢাকার ইসলামিয়া চু হাসপাতালের অধ্যাপক ও পরিচালক। এ বিষয়ে তার পারঙ্গমতা সর্বজনবিদিত। সারা দেশে তার প্রচুর সুখ্যাতি। তার কাছেই শুনুন ছানি রোগ ও এর চিকিৎসা বিষয়ে।
সাাৎকার নিয়েছেন স্বকৃত নোমান

সাপ্তাহিক : চোখের ছানি কী?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : প্রকৃতপে আমাদের চোখ আর ক্যামেরার ম্যাকানিজম প্রায় এক। বাইরের কোনো ছবি ক্যামেরার লেন্সে একটি ছায়া তৈরি করে যে ছায়া প্রিন্ট হয়ে আসলে আমরা ছবিটা দেখতে পাই। ক্যামেরার মধ্যে একটি বা একাধিক লেন্স দিয়ে এই ছায়াটা তৈরি করা হয়। ঠিক তেমনই মানুষের চোখেও একটি লেন্স থাকে। এই লেন্সের মাধ্যমে বাইরের ছবি চোখের রেটিনার ওপরে পড়ে। রেটিনার ওপরে পড়লে রেটিনা থেকে এটি মস্তিষ্কে চলে যায় আমাদের নার্ভস সিস্টেমের মাধ্যমে। ফলে আমরা দেখতে পাই। যে লেন্সের মাধ্যমে বাইরের যে কোনো জিনিসের ছবি আমাদের রেটিনার ওপরে পড়ে সে লেন্স যে কোনো লেন্সের মতোই স্বচ্ছ, যার কারণে আমরা ছবি দেখতে পাই। কিন্তু যেহেতু এই লেন্সটি সাধারণ কাচের লেন্স নয় এবং এটি বায়োলজিক্যাল অথবা মানুষের শরীরের কোষ থেকে তৈরি। তাই বয়সের কারণে অথবা আঘাত বা অন্য কোনো কারণে এই লেন্সটি স্বচ্ছ নাও থাকতে পারে। যদি ঘোলা হয়ে যায় তখন বাইরের ছবি থেকে যে আলো আসবে তা রেটিনার ওপর পড়বে না। এই ঘোলা হয়ে যাওয়াকেই বলা হয় চোখের ছানি।

সাপ্তাহিক : ছানি কেন হয়?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : প্রকৃতপে লেন্স তৈরি হয় আমাদের শরীরের কোষ দিয়ে। শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন বিভিন্ন কারণে তিগ্রস্ত হতে পারে, আঘাতের কারণে বা বয়সের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে, ঠিক তেমনই লেন্সটা যেহেতু শরীরেরই একটা অংশÑ লেন্সেরও এই পরিবর্তন হতে পারে। কোনো কারণে যদি লেন্সের পরিবর্তন হয় তখন লেন্স ঘোলা হয়ে যেতে পারে। শরীরের যে কোনো জিনিসকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। আমাদের শরীরে আমাদের চোখের লেন্সকে জেনেটিক সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করেছে যেন এটি সারাজীবন স্বচ্ছ থাকে। কোনো কারণে এই স্বচ্ছতার সিস্টেমের মধ্যে সামান্যতম সমস্যা দেখা দিলেই এই লেন্সটা ঘোলা হয়ে যেতে পারে।

সাপ্তাহিক : ছানি শুধু কী বয়স্ক ব্যক্তিদেরই হয়?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : চোখের ছানি শুধু বয়স্ক ব্যক্তিদেরই হয় না, তবে বয়স্ক ব্যক্তিদের বেশি হয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সমস্ত অঙ্গই অকার্যকর, দুর্বল হতে থাকে। একই প্রক্রিয়ায় চোখের লেন্সও একসময় না একসময় ঘোলা হয়ে যাবে। আমাদের দেশে প্রাপ্ত ছানির ৮০ ভাগই বয়সের কারণে হয়ে থাকে।

সাপ্তাহিক : ছানির পরিণতি কী?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : ক্যাটারেক্টের পরিণতি অন্ধত্ব। লেন্সটা স্বচ্ছ থাকলে, বাইরের আলো চোখের মধ্যে পড়লে আমরা দেখতে পাই, কিন্তু যদি লেন্সটা ঘোলা হয়ে যায় তাহলে বাইরের আলো চোখের রেটিনাতে পড়বে না। ফলে রোগী দেখবে না। প্রথমেই যদি সামান্য ঘোলা হয় তাহলে সামান্য কম দেখবে। আস্তে আস্তে যত বেশি লেন্স ঘোলা হতে থাকবে রোগী তত কম দেখবে। একপর্যায়ে পুরোটাই নষ্ট হয়ে যাবে।

সাপ্তাহিক : চোখের ছানি অপারেশনের আগে অনেক সময় ডাক্তার রোগীকে কিছুদিন অপো করতে বলেনÑ এর কারণ কী?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : না, ছানি অপারেশনের আগে সামান্যতম দেরি করার দরকার নেই। প্রকৃতপক্ষে আগেকার দিনে যখন উন্নত প্রযুক্তি ছিল না, মাইক্রোস্কোপ বা ফ্যাকোসার্জারির প্রযুক্তি ছিল না, তখন আমরা খালি চোখে ছানি অপারেশন করতাম। যেহেতু লেন্স অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং অত্যন্ত কোমল গঠনের তাই তখন ছানি অপারেশনের সময় লেন্সটাকে সম্পূর্ণ বের করে নিয়ে আসা হতো। তারপর চশমা দিয়ে রোগীর পরবর্তী চিকিৎা করা হতো। ছানি যখন পাকে মানে ছানিটি যখন শক্ত হয়ে সাদা যায়, তখন এর সংযোগগুলো হালকা হয়ে যায়। তখন এটাকে বের করে আনা সুবিধাজনক। এজন্য আমরা রোগীদের বলতাম, আপনার ছানি এখনো পাকেনি, ছানি পাকুক, তারপরে অপারেশন করুন। কিন্তু এখন যত তাড়াতাড়ি ছানি অপারেশন করা যায়, ততই ভালো এবং সুবিধাজনক। কারণ বয়স বাড়লে নানা রোগ দেখা দেয়। সুতরাং আগে করে ফেলাটাই ভালো।

সাপ্তাহিক : স্বাস্থ্যগত কোনো কারণ কি চোখের ছানি অপারেশনের জন্য বাধা হতে পারে?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : স্বাস্থ্যগত কারণ ছানির কারণও হতে পারে, আবার ছানি অপারেশনের বাধাও হতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত রোগ, জন্মগত ভাইরাস, ইনফেকশনÑ এগুলোর জন্য ছানি হতে পারে। ছানি অপারেশনের পূর্বে আমরা রোগীর স্বাস্থ্যের কতগুলো পরীা করে নিই, যাতে ছানি অপারেশনে কোনো সমস্যা না হয়।

সাপ্তাহিক : ছানি অপারেশন কী কোনো বড় অপারেশন?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : খুব বড় ধরনের অপারেশন নয়। তবে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির অপারেশন এটি। সাধারণত কোনো অপারেশনের সঙ্গে ছানি অপারেশনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলোÑ অন্য অপারেশনে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই অপারেশন করি; যাতে কোনো ইনফেকশন না হয়। তারপরও যদি কোনো সমস্যা বা ইনফেকশন হয় সেই সমস্যাটাকে আস্তে আস্তে মেকাপ করা যায়। ছানি ছোট্ট একটা অপারেশন। এই অপারেশনে যদি কোনো ইনফেকশন হয় রোগীর দৃষ্টি সারাজীবনের জন্য নষ্টও হয়ে যেতে পারে। এজন্য ছানি অপারেশন যেখানে করা হয় সেখানে অন্য অপারেশন করা হয় না।

সাপ্তাহিক : অপারেশনের কতদিন পর রোগী বাড়ি যেতে পারে?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : এক ঘণ্টা পরেই যেতে পারে।
সাপ্তাহিক : অপারেশনের পর রোগীর দৃষ্টিশক্তির উন্নতি কতটুকু হয়? সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কেমন সময় লাগে?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : রোগীর যদি অন্য কোনো রোগ না থাকে তবে এক শ ভাগ উন্নতি হবে। সুস্থ হতে আমরা সাধারণত ২৪ ঘণ্টা ব্যান্ডেজ রাখতে বলি, তারপর বলি কালো চশমা পরতে। দু-একদিন সাবধান থাকতে হবে, সাতদিন পর পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়া যায়।

সাপ্তাহিক : অপারেশন পরবর্তী রোগীর যতœ সম্পর্কে বলুন?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : এখনকার উন্নত চিকিৎসায় বিশেষ কোনো যতœ নিতে হয় না। তবুও জোরে চিৎকার করা, দৌড়ানো, মাথা ঝাঁকানোÑ ইত্যাদি কাজ না করলেই ভালো। ৭-১৫ দিন পানি না লাগাতে বলি আমরা।

সাপ্তাহিক : অপারেশন পরবর্তী জটিলতা কী কী হতে পারে?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : কোনো জটিলতা হবে না। তবে অপারেশনের সময় ডাক্তারের অসতর্কতায় কোনো সমস্যা হলে কিছু কিছু রোগ দেখা দিতে পারে। এগুলোর চিকিৎসাও আছে

সাপ্তাহিক : অপারেশনে কেমন খরচ হয়?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : একসঙ্গে অনেক রোগী অপারেশন করলে খরচ কমে আসে, মাত্র দুই-তিন হাজার টাকায় সম্ভব। কিন্তু অল্প রোগীর েেত্র খরচ তো বেশি পড়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এ অপারেশনের জন্য একটা মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়। একটি দিয়ে তো অনেক রোগীর চিকিৎসা করা যায়। তা ছাড়া খরচ কম-বেশি সেটা লেন্সে ওপরও নির্ভর করে।

সাপ্তাহিক : বাংলাদেশে চোখের ছানি অপারেশনের বর্তমান প্রোপট/অবস্থা সম্পর্কে বলুন?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : চোখের ছানি অতীতের মতো বর্তমানেও আমাদের দেশে একটা সমস্যা। তবে আগের চেয়ে এখন এ সমস্যা অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে ২০০৩-এর এক বেসরকারি হিসাব মতে, আমাদের দেশে ৫ লাখ ৫০ হাজার ছানি রোগী রয়েছে। তার মধ্যে ২০০৩-এ অপারেশন হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার; যা মোট আক্রান্তের মাত্র ৫ ভাগের ১ ভাগ। প্রতি বছর নতুন নতুন রোগী যোগ হচ্ছে। সেই হিসাবে সামগ্রিকভাবে এগুলোর চিকিৎসা করাতে গেলে প্রতি বছর আড়াই থেকে তিন লা অপারেশন করতে হবে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে এ নিয়ে। এর চিকিৎ এখন অনেক সহজ এবং স্বল্প খরচে করা যাচ্ছে। ছানি সাধারণত বয়স্ক রোগীদের বেশি হয়। অসচেতনতার কারণেই অনেকাংশে এর চিকিৎসা হচ্ছে না। বেশিরভাগ েেত্ দরিদ্রতার কারণে রোগীরা এর চিকিৎসা নেয় না। তা ছাড়া আমাদের চিকিসক, জনবল এবং যন্ত্রপাতিরও সংকট আছে। তাই এসব েেত্র আমাদের আরও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাপ্তাহিক : উন্নত বিশ্বে বর্তমানে চোখের ছানি অপারেশনের কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়? বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা কতটুকু?
অধ্যাপক কামালউদ্দিন : উন্নত বিশ্বে যে প্রযুক্তি ব্যবহার হয় বাংলাদেশেও এখন তাই হচ্ছে। যান্ত্রিকভাবে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সেসব দেশে যে রেজাল্ট, আমাদের দেশেও একই রেজাল্ট।

ছবি : রাশেদুজ্জামান
অধ্যাপক এ.এস.এম কামালউদ্দিন
চেম্বার : ৩০ গ্রিন সুপার মার্কেট (দ্বিতীয় তলা)
গ্রিন রোড, ফার্মগেট, ঢাকা
রোগী দেখার সময় : বিকেল ৫টা থেকে ৮টা
শুক্রবার ও শনিবার ছাড়া)
ফোন : ৮১২২৪৭০